প্রণোদনা অর্থের বড় অংশ চলে যাচ্ছে পুঁজিবাজারে

প্রণোদনা অর্থের বড় অংশ চলে যাচ্ছে পুঁজিবাজারে

নিজস্ব প্রতিবেদক : প্রণোদনা প্যাকেজের অর্থ ব্যয় হওয়ার কথা কোম্পানির চলতি মূলধন হিসাবে। কিন্তু প্রণোধনার অর্থ চলতি মূলধনে ব্যয় না হয়ে অনুৎপাদনশীল খাতে চলে যাচ্ছে। কেউ কেউ এ অর্থে জমি কিনছেন। কেউ ব্যয় করছেন গাড়ি-বাড়ি ক্রয়ে। তবে প্রণোদনা অর্থের বড় একটি অংশ চলে যাচ্ছে পুঁজিবাজারে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‘অফ-সাইট সুপারভিশন’ বিভাগের পর্যবেক্ষণে প্রণোদনার ঋণের অপব্যবহারের এমন চিত্র উঠে এসেছে।

প্রণোধনার ঋণের অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিতে কঠোর হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে দু-একদিনের মধ্যেই এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি সূত্র বলছে, বৃহৎ শিল্প ও সেবা খাতের জন্য ঘোষিত ৪০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের অর্থের অপব্যবহার বেশি হচ্ছে। চলতি মূলধন খাতে ব্যয় করবেন—এমন শর্ত মেনেই ব্যাংক থেকে গ্রাহকরা সাড়ে ৪ শতাংশ সুদের এ ঋণ নিচ্ছেন। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ, বিভিন্ন ধরনের ইউটিলিটি বিল, শিল্পের কাঁচামাল ক্রয়সহ উৎপাদন সচল রাখতে নৈমিত্তিক ব্যয় চলতি মূলধন হিসেবে বিবেচিত হয়।

কিন্তু শর্ত ভঙ্গ করে কিছু গ্রাহক ঋণের একটি অংশ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করছেন। সাম্প্রতিক সময়ে পুঁজিবাজারে বড় উল্লম্ফনের পেছনে প্রণোদনা প্যাকেজের অর্থ বিনিয়োগের প্রমাণ পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বৃহৎ শিল্প ও সেবা খাতের প্রণোদনার পাশাপাশি সিএসএমই খাতের জন্য ঘোষিত ২০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজেরও অপব্যবহার হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে আলোচনাও হয়েছে। এর আগেও ঋণের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তার ভাষ্য হলো, শুধু ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানের চলতি মূলধন খাতে প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণের অর্থ ব্যয় হওয়ার কথা। কিন্তু অনেক গ্রাহকই প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় ঋণ নিয়ে অনুৎপাদনশীল বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ ও ব্যয় করছেন।

তবে ফান্ড ডাইভার্ট বা ঋণের অপব্যয় সবচেয়ে বেশি হচ্ছে পুঁজিবাজারে। প্রণোদনার ঋণ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ হওয়ায় ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচকে বড় উল্লম্ফন হয়েছে। ঋণ বিতরণকারী ব্যাংকের গাফিলতির কারণেই এমনটি হচ্ছে।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান এ বিষয়ে সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ব্যাংকের পক্ষে গ্রাহকদের ঋণের গন্তব্য সবসময় নজরদারিতে রাখা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, কোনো গ্রাহকের উদ্দেশ্য যদি মহৎ না হয়, তাহলে তার নেয়া ঋণের অপব্যয় ঠেকানো কঠিন। প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় গ্রাহক ব্যাংক থেকে ঋণ পাচ্ছেন এক বছরের জন্য। এখন কোনো গ্রাহক যদি ঋণ নিয়ে প্রথমে চলতি মূলধন হিসেবে বিনিয়োগ করে, পরবর্তী সময়ে সেখান থেকে অর্থ সরিয়ে অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় করে, তাহলে সেটি চিহ্নিত করা দুষ্কর। আমরা প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণ যথোপযুক্ত ব্যক্তির হাতে পৌঁছে দেয়ার চেষ্টা করছি। ঋণের সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করার দায়িত্ব গ্রাহকদের ওপরই বর্তায়।

মহামারি করোনাভাইরাসের প্রভাবে গত বছরের প্রথমার্ধে বেহাল অবস্থায় ছিল দেশের পুঁজিবাজার। বেশির ভাগ শেয়ারের ধারাবাহিক দরপতনে প্রতিদিনই সূচক হারাচ্ছিল ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স। দরপতন ঠেকাতে তালিকাভুক্ত কোম্পানির ফ্লোরপ্রাইস নির্ধারণ করে দেয় পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।

করোনা সংক্রমণ শনাক্তের পর এক বছরের বেশি সময় পেরিয়েছে। কিন্তু এখনো কমেনি সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার। উল্টো মহামারীর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে প্রতিনিয়ত কঠোর থেকে কঠোরতর বিধিনিষেধ জারি করছে সরকার। এ অবস্থার মধ্যেও গত তিন মাস ধরে দেশের পুঁজিবাজারে সূচক ও শেয়ারের দামে উত্থান চলছে। এমনকি অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে নতুন উচ্চতায় উঠেছে ডিএসইর বাজার মূলধন ও প্রধান সূচক।

পুঁজিবাজারের তথ্য বলছে, পুঁজিবাজারে সবচেয়ে বড় উল্লম্ফন হয়েছে গত তিন মাসে। চলতি বছরের ১৯ এপ্রিল ডিএসইর বাজার মূলধন ছিল ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৩১৫ কোটি টাকা। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে ১৯ জুলাই ডিএসইর বাজার মূলধন ৫ লাখ ৩৫ হাজার ১৮৫ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। এ তিন মাসে বাজার মূলধন বেড়েছে ৭০ হাজার ৮৬৯ কোটি টাকা।

গত ১৯ এপ্রিল ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ছিল ৫ হাজার ৩৪৯ পয়েন্ট। গত তিন মাসে ডিএসইএক্সে ১ হাজার ৫৬ পয়েন্ট যুক্ত হয়েছে। ১৯ জুলাই ডিএসইএক্সের সূচক দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৪০৫ পয়েন্টে। তবে পুঁজিবাজারের সাম্প্রতিক উত্থানের সময় দুর্বল কোম্পানির শেয়ারে সবচেয়ে বেশি রিটার্ন এসেছে।

মহামারি করোনাভাইরাসে সৃষ্ট আর্থিক দুর্যোগ থেকে পরিত্রাণ দিতে এখন পর্যন্ত ২৮টি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে সরকার। অর্থের পরিমাপে প্রণোদনা প্যাকেজের আকার ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকার বেশি। বিশাল অংকের এ প্রণোদনার মধ্যে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকাই ঋণ হিসেবে বিতরণের নেতৃত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে রয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত বৃহৎ শিল্প ও সেবা খাতের জন্য ৪০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ। ক্ষতিগ্রস্ত সিএসএমই খাতের জন্যও ২০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়।

ব্যাংকঋণ হিসেবে দেয়া বৃহৎ শিল্প ও সেবা খাতের প্রণোদনা প্যাকেজের সুদহার নির্ধারণ করা হয় ৪ দশমিক ৫০ শতাংশ। আর সিএসএমই খাতের প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে নেয়া ঋণের জন্য গ্রাহকরা ৪ শতাংশ সুদ পরিশোধ করছেন। ২০২০ সালের এপ্রিলেই এ দুটি প্যাকেজের আওতায় ঋণ বিতরণের জন্য নীতিমালা ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

ঋণ বিতরণের নীতিমালায় বলা হয়েছিল, প্রণোদনা প্যাকেজগুলোর মেয়াদ হবে তিন বছর। তবে একজন উদ্যোক্তা কেবল এক বছরের জন্য স্বল্প সুদের ঋণ সুবিধা ভোগ করবেন। ঋণ বিতরণের দিন থেকে এক বছর পার হলে সে ঋণের বিপরীতে সরকার থেকে কোনো সুদ ভর্তুকি দেয়া হবে না। ঋণটি আদায় না হলে সেটি বিতরণকারী ব্যাংকগুলোর স্বাভাবিক ঋণ বলে গণ্য হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জারীকৃত নীতিমালার আওতায় এরই মধ্যে বৃহৎ শিল্প ও সেবা খাতের জন্য ঘোষিত ৪০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে বিতরণকৃত বেশির ভাগ ঋণের এক বছর পূর্ণ হয়েছে। ১ জুলাই দ্বিতীয় মেয়াদে এ প্যাকেজ থেকে ঋণ বিতরণ শুরু করেছে ব্যাংকগুলো। পাশাপাশি সিএসএমই খাতের ২০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ থেকেও দ্বিতীয় মেয়াদে ঋণ বিতরণ শুরু হয়েছে। প্রথম মেয়াদে ঋণ বিতরণ শেষ হওয়ার পর প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণের অপব্যবহারের প্রমাণ পেল কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

তবে পুঁজিবাজারে সাম্প্রতিক উত্থানের পেছনে ব্যাংকে মেয়াদি আমানতের সুদহার ইতিহাসের সর্বনিম্নে নেমে আসাও ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, অলস তারল্যের চাপে দেশের ব্যাংক খাতে মেয়াদি আমানতের সুদহার ইতিহাসের সর্বনিম্নে নেমে এসেছে। বেশির ভাগ বেসরকারি ব্যাংক তিন-ছয় মাস মেয়াদি আমানতে সুদ দিচ্ছে ১ থেকে ৪ শতাংশ। এ অবস্থায় সাধারণ মানুষ ব্যাংকে থাকা আমানত তুলে নিয়ে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করেছে। পুঁজিবাজারের বড় উল্লম্ফনের পেছনে এটিও বড় ভূমিকা রাখছে। সূত্র: বণিক বার্তা

শেয়ারনিউজ, ২৫ জুলাই ২০২১
https://www.sharenews24.com/article/37566/index.html

Share this post